আইয়ুব আলী ময়মনসিংহ :: ময়মনসিংহে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস পালন করেছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। দিবসটি উপলক্ষে শনিবার সকালে নগরীর সিকে ঘোষ রোডে র্যালী শেষে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে গুমের শিকার ভিকটিমরা তাদের জীবনের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার বর্ণনা তুলে ধরেন।
গুমের শিকার ব্যাক্তিরা বলেন, শুধুমাত্র রাষ্ট্রের তৈরি করা ‘জঙ্গি’ নাটকের অংশ হিসেবে বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে মাসের পর মাস গুম করে নির্যাতন চালিয়েছে। হাসিনার শাসন পতনের মধ্য দিয়ে সেই নাটকের অবসান হলেও, এই নির্মম যন্ত্রনার ভোগান্তি শেষ হয়নি। আজও তারা মিথ্যা মামলার ভারে ন্যুব্জ হয়ে আছেন।
মানবন্ধনে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ার ইমাম মেহেদী হাসান ডলার জানান, “রাস্তা থেকে আমাকে চোখ বেঁধে তুলে নেওয়া হয়। গুমের ৬ মাস পর আমাকে ভারতীয় স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের হাতে তুলে দেয় র্যাব। ৯ মাস পর পশ্চিমবঙ্গের কারাগার থেকে আমি ফিরে আসলেও আমার জীবনে শান্তি ফিরেনি। আমার বিরুদ্ধে আজও মামলা চলছে, অথচ আমি কোনো অপরাধ করিনি।”
তিনি আরও বলেন, “আমার সঙ্গে যা হয়েছে, তা একজন মুসলমান, একজন নিরীহ নাগরিকের সঙ্গে হতে পারে না। আমি ‘জঙ্গি’ তকমা নিয়ে বেঁচে আছি, যা আসলে র্যাবের বানানো এক চক্রান্ত ছিল।”
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন গুমের শিকার ভিকটিম মুক্তাগাছার রাশেদ। তিনি বলেন, “আমাদের গুমক করে বাধ্য করা হয় জঙ্গি স্বীকারোক্তি দিতে। আমরা রাজি না হওয়ায় আমাদের বিরুদ্ধে একের পর এক ডাকাতি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে জেল হাজতে পাঠানো হয়। আজো মামলা চলছে। অথচ আমরা সাধারণ মানুষ, কৃষিকাজ করি।”
অন্য এক হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা শোনান মুক্তাগাছার গোলাম মোস্তফা। তিনি নারায়ণগঞ্জে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। ডিউটি শেষে বাসায় ফেরার পথে তাকে তুলে নেয় র্যাব। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না, কোনো অভিযোগ ছিল না। শুধুমাত্র মুখে দাড়ি থাকার কারণে তাকে ‘জঙ্গি’ বানিয়ে ৫২ দিন উলঙ্গ করে নির্যাতন করা হয়।
গোলাম মোস্তফা বলেন, “পরিবারের সদস্যরা কোথাও আমাকে খুঁজে পায়নি। ৯২ দিন আমি গুম ছিলাম র্যাবের গোপন বন্দিশালায়। আমাকে বলা হতো ‘তুই বল, তুই জঙ্গি’। আমি বারবার বলেছি আমি সাধারণ পোশাক শ্রমিক, কিন্তু তারা শোনেনি। শেষে ৯২ দিন পর আদালতে হাজির করে আমার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেয়।”
মানববন্ধনে ভিকটিমরা আরও বলেন, “আজ আমরা বেঁচে আছি, কিন্তু জীবনের স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলেছি। মিথ্যা মামলার কারণে কাজ করতে পারি না, পরিবার নিয়ে নিরাপদে চলতে পারি না। সমাজ আমাদের ‘জঙ্গি’ ভাবে, অথচ আমরা গুমের শিকার, নির্যাতনের শিকার, রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের শিকার।”
তারা বর্তমান সরকারের প্রতি আকুল আবেদন জানান, যেন তাদের বিরুদ্ধে চলমান মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হয়। তারা বলেন, “আমরা কোনো অপরাধ করিনি, আমরা কোনো অপরাধী না। আমরা ফিরে এসেছি এক টুকরো আশার জন্য, ন্যায়ের জন্য। আমাদের পরিবারকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ দিন।”
মানববন্ধনে গুমের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে জাতীয়তাবাদী আইনজীবি ফোরামের সহ-সভাপতি এবং ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট নূরুল হক বলেন,, “গুম এবং মিথ্যা মামলা একে অপরের পরিপূরক। একটিকে বাদ দিলে অন্যটি প্রমাণ হয়। তাই এই ‘জঙ্গি নাটক’ নির্মাণে যাঁরা জড়িত ছিলেন-তাদের বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। এটাই ভবিষ্যতের জন্য রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।”
মানববন্ধনে সাংবাদিক ইউনিয়ন ময়মনসিংহের সভাপতি এম আইয়ুব আলী বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে চলা কর্তৃত্ববাদী সরকারের আমলে বাংলাদেশে বেআইনি আটক কেন্দ্র ও গোপন বন্দিশালার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ভিন্নমতাবলম্বী এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় কণ্ঠস্বরদের গুম করে নিঃস্ব করা হয়েছে। অনেকে আজও ফেরেননি, অনেকে ফিরেও মিথ্যা মামলার আসামি হয়েছেন, কেউ কেউ কনডেমড সেলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের ওপর চালানো হয়েছে মানসিক ও আর্থিক নির্যাতন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জেলা সমন্বয় কমিটির সদস্য এড. এটিএম মাহবুব উল আলম বলেন, “শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম ছিল একটি পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় অপরাধ। গুমের মাধ্যমে বিরোধী রাজনীতিকে নির্মূল করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। এখন সময় এসেছে এসব অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের।”
ময়মনসিংহ মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট হান্নান খান বলেন, “যারা গুমের শিকার হয়েছেন, তারা ফিরে এসে নতুন করে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। গুম যেন আর কখনো এই দেশে না ঘটে, সে জন্য আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।”
জুলাই রেভ্যুলেশনারী এলায়েন্স ময়মনসিংহের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “গুমের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, এগুলো রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ধারাবাহিকতা। এসব ঘটনার নেপথ্যে যারা ছিলেন, তাদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনতে হবে।”
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ মহানগর বিএনপির যুগ্ম-আহবায়ক একেএম মাহবুবুল আলম, এড. রেজাউল করিম চৌধুরি, সাংবাদিক আমান উল্লাহ আকন্দ জাহাঙ্গীর, আব্দুল আউয়াল, আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাইফুল ইসলাম তরফদার, মানবাধিকার কর্মী তাজবী উল হোসনা, দেলোয়ার হোসেন রাজীব, বাকিউল ইসলাম, রিপন মিয়া প্রমুখ।
দিবসটি উপলক্ষ্যে অধিকার-এর পক্ষ থেকে পাঠ করা বিবৃতিতে বলা হয়, ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘে গৃহীত ‘গুম হওয়া থেকে সুরক্ষার আন্তর্জাতিক সনদ’ ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অনুমোদন করে। অধিকার দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে এই সনদের অনুমোদনের দাবি জানিয়ে এসেছে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়, গুম একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হলেও, বিগত সরকার এটিকে রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ডিজিএফআই, র্যাব এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ বেআইনি বন্দি বিনিময় চক্রের মাধ্যমেও বহু নাগরিক গুম হয়েছেন।