যানজট, জলজট, বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা, নাগরিক সুবিধাদির সংকট, অপ্রতুল পার্ক-খেলার মাঠ-সবুজ এলাকা, পরিবেশ বিপর্যয় প্রভৃতি কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন নগর এলাকা ক্রমশ অবাসযোগ্য হয়ে পড়েছে। রাজধানী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম অবাসযোগ্য নগরী। একই ধরনের চাপের মুখে রয়েছে চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লাসহ দেশের অন্যান্য দ্রুত বিস্তৃত নগরগুলোও। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন, দুর্বল সেবা ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি নগরের সংকটকে জটিল ও বহুমাত্রিক করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে দেশের নগরগুলোকে বাসযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে সঠিক নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার জন্য কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের দাবী জানাচ্ছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) । ব্যয়বহুল পরিকল্পনা ও উদ্যোগকে প্রাধান্য না নিয়ে নগরসমূহকে টেকসই করতে ব্যয়সাশ্রয়ী, কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন নিশ্চিত করা এবং জনগনের প্রকৃত চাহিদাকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন মনে করে আইপিডি। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আইপিডির পক্ষ থেকে নিচের প্রস্তাবনাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে সরকারের কাছে সুপারিশ করা হল:
১) সবার আগে জরুরি কমিউনিটি ও নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে এলাকাভিত্তিক নগর সমস্যা চিহ্নিত করা এবং ব্যয়সাশ্রয়ী ও সহজসাধ্য সমাধান চিহ্নিত করা।
২) নির্বাচিত মেয়রের বদলে সরকার সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক বসালেও সিটি করপোরেশনগুলোতে কাউন্সিলর না থাকায় নগরবাসীর ভোগান্তি কমবে না। আগের ছয়টি সিটি কর্পোরেশন এর পাশাপাশি সরকার নতুন করে আরও পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন এর প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। প্রশাসক দিয়ে নগরের টেকসই উন্নয়ন হবে না। মূলত ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে বিভিন্ন ধরনের নাগরিক সেবা দেওয়া হয়। অতি দ্রুত নির্বাচন না হলে কাউন্সিলরগণের অনুপস্থিতিতে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে। ফলে অনতিবিলম্বে সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভার নির্বাচন আয়োজন এর মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নগর এলাকার সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ এর মাধ্যমে নগর সমস্যা সমাধানের সুযোগ করে দিতে হবে।
৩) নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে টেকসই, কার্যকর ও সাশ্রয়ী করতে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। কেবল বড় বড় ফ্লাইওভার, মেগা অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে যানজট সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য গণপরিবহনকেন্দ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ, মিনিবাস, রিকশা ও অন্যান্য ছোট যানবাহনের সঙ্গে সুশৃঙ্খল সমন্বয় এবং পথচারীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। নগরের রাস্তা শুধু যান্ত্রিক যানবাহনের জন্য নয়, বরং মানুষের নিরাপদ চলাচলের উপযোগী হতে হবে। রাজধানী ঢাকা এবং অন্যান্য শহরে বহুমাত্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে মেট্রোরেল, মনোরেল, লাইট র্যাপিড ট্রানজিট (এলআরটি) ও কমিউটার ট্রেনের পাশাপাশি বাসভিত্তিক বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) এবং আধুনিক বাস ও মিনিবাস সেবাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাস সার্ভিসকে ঢেলে সাজাতে বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে জলপথ ও রেলপথের সম্ভাবনাকেও নগর পরিবহন ব্যবস্থায় কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে।
৪) নগর এলাকার ফুটপাতগুলোকে হাঁটার উপযোগী করতে পরিকল্পনামাফিক অবৈধ দখল, হকার, দোকানপাট সরিয়ে দিতে হবে। এক্ষেত্রে সত্যিকারভাবে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের ফ্যামিলি কার্ড, সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ এবং কর্মসংস্থান প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে হকার ও রাস্তা দখলের সাথে সম্পৃক্ত রাজনৈতিক, প্রভাবশালী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।
বায়োমেট্রিক আইডেন্টিফিকেশন এর মাধ্যমে বৈধ হকারদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৫) নগরের হারিয়ে যাওয়া খাল ও নদীগুলো পুনরুদ্ধার করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করা জরুরি। পাশাপাশি উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের খাল খনন কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে দখলদারদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে, যাদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। তাই খাল পুনরুদ্ধারের মতো উদ্যোগ সফল করতে বলিষ্ঠ রাজনৈতিক অংগীকার অপরিহার্য।
৬) নগরের বর্জ্য সমস্যার সমাধানে
সকল সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার জন্য সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স গঠন।
খাল, সড়কের পাশে ও উন্মুক্ত জায়গায় বর্জ্য ফেলা বন্ধে জরুরি নির্দেশনা ও মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম চালু করতে হবে। প্রধান ল্যান্ডফিল সাইটগুলোর ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা ও তাৎক্ষণিক সংস্কার পরিকল্পনা। জৈব বর্জ্য, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য ও অন্যান্য বর্জ্যকে অবশিষ্ট বর্জ্য উৎসে পৃথকীকরণ এর উদ্যোগের পাশাপাশি বর্জ্য পুন:ব্যবহার ও জৈব বর্জ্যকে কম্পোস্টে পরিণত করবার উদ্যোগ নিতে হবে।
৭) এলাকাভিত্তিক খেলার মাঠ, পার্ক ও বিনোদন সুবিধা তৈরির জন্য কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে রাষ্ট্রকে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে যে সকল ওয়ার্ডে বা এলাকায় একেবারেই খেলার মাঠ নেই সেই সব এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। একই সঙ্গে ক্লাব বা বিভিন্ন গোষ্ঠীর অবৈধ দখলে থাকা মাঠগুলো দ্রুত এলাকাবাসীর ব্যবহারের জন্য ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
৮) বর্তমানে সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থার মধ্যে যে তীব্র সমন্বয়হীনতা রয়েছে, তা উন্নয়নের সুফলকে বাধাগ্রস্ত করছে। এসব সংস্থার মধ্যে জবাবদিহিমূলক ও তথ্যনির্ভর একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন মানে শুধু বড় বাজেটের মেগা প্রকল্প নয়; প্রকৃত উন্নয়ন হলো পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
৯) নগর পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অপরাধ দমনে দ্রুত বিশেষায়িত পরিকল্পনা আদালত গঠন করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যমান পরিবেশ আদালতকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি হয় এবং আইনের প্রয়োগে দৃশ্যমান ফল পাওয়া যায়।
১০) পরিবেশ ও ভূমি ব্যবহার–সংক্রান্ত আইনগুলোকে যুগোপযোগীভাবে সংস্কার করে পরিবেশ ধ্বংস, দখল এবং দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষত দূষণজনিত অপরাধের জরিমানার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তা কার্যকরভাবে আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে আইন ভঙ্গের প্রবণতা কমে আসে।
১১) দেশের উন্নয়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বার্থের দ্বন্দ্বে জড়িত ব্যবসায়ী, শিল্পগোষ্ঠী ও অন্যান্য স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাব বন্ধ করাও জরুরি হয়ে পড়েছে। মেগা, বিশেষ ও উন্নয়ন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, নির্বাচন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদেশি রাষ্ট্র বা সংস্থা, রাজনৈতিক গোষ্ঠী কিংবা কর্পোরেট স্বার্থের অযাচিত প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপযোগিতা, জনকল্যাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উন্নয়ন যেন কেবল প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার মাধ্যম না হয়ে জনগণের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করে—এমন নীতিগত অবস্থান স্পষ্টভাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন।
১২) নগর উন্নয়ন কার্যক্রমে সব ধরনের দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বোপরি নগর উন্নয়নসংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, তথ্যপ্রকাশ ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক ও তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করবার মাধ্যমে বাংলাদেশের নগর এলাকাসমূহকে উন্নত ও বাসযোগ্য করবার আহবান জানাচ্ছে আইপিডি ।













