মো. আবু বকর:: বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)’র চেয়ারম্যান, জালাল আহমেদ বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে আমাদের সবচেয়ে বড় বাধা প্রযুক্তি নয়, পরিবর্তনের মানসিকতা। বিদ্যুৎকেন্দ্র বলতে আমাদের প্রচলিত ধারণায় এখনও থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্টই ভেসে ওঠে; এই মানসিকতা বদলাতে হবে। মাতারবাড়ীর মতো বিদ্যমান জমি কাজে লাগিয়ে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এখন প্রয়োজন এই পরিবর্তনের বাধা ভেঙে দ্রুত সৌরবিদ্যুতের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং পরিচ্ছন্ন ও ন্যায়ভিত্তিক জ্বালানি ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার লক্ষ্যে শুরু হওয়া ”নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এখনই’ প্রচারাভিযানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি বক্তৃতায় এ কথা বলেন।
অবহেলায় ফেলে রাখা সরকারি বিভিন্ন জমি ব্যবহারের উপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সরকার বন্ধ উত্তরবঙ্গে হওয়া বিভিন্ন চিনিকলের জমিগুলো ব্যবহার করতে পারে। ব্যবহার করতে পারে রেল লাইনের দুই পাশে বিশাল জমি এবং চা বাগানে ফেলে রাখা অব্যবহৃত জমি সোলার প্ল্যান্টের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে।
বিদ্যুৎ ঘাটতি কমিয়ে আনার জন্য সরকার ছয় মাসের যে সুযোগ দিয়েছে এটা ভালো পদক্ষেপ, ভিয়েতনামও এমনটা করেছিল।
নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা গ্রহণের জন্য আবাসিক বাড়ির ছাদে ব্যাটারি সহ সৌর প্যানেল বসানোর পরামর্শ তার।
পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়কনাগরিকসংগঠন ধরিত্রীরক্ষায়আমরা (ধরা) ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ’র নেতৃত্বে৩৭টিনাগরিক ও সামাজিকসংগঠনেরযৌথ-আয়োজনেশনিবার ঢাকার সিরডাপ ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে এ প্রচারাভিযানের উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়। মাসব্যাপী এ প্রচারাভিযানের আওতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, সাইকেল ও নৌ-র্যালি, সড়ক শোভাযাত্রা, উপকূলীয় পদযাত্রা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে উপকূলীয় পদযাত্রার আনুষ্ঠানিক যাত্রাও শুরু হয়; প্রধান অতিথি পদযাত্রার বাস্তবায়নকারী ও বেঙ্গল পিস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মাশফিকুল হাসান টনির হাতে প্রচারাভিযানের ব্যানার হস্তান্তর করেন, যা পদযাত্রাটির আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’র সহ-আহ্বায়ক এম এস সিদ্দিকী তাঁর সভাপতির বক্তব্যে বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়—এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। আমদানী নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে নিজেদের জ্বালানি নিজেদেরই তৈরি করতে হবে। সৌর, বায়ু, বায়োমাসসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার দেশজুড়ে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় পরিসরে রূপান্তরের সময়।”
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’র সদস্য সচিব ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ’র সমন্বয়ক শরীফ জামিল তাঁর স্বাগত বক্তব্যে বলেন, “বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আজ আমদানি নির্ভরতার কারণে গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত ও পরিকল্পিত রূপান্তরের কোনো বিকল্প নেই। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনে এখনই সুস্পষ্ট পথনকশা, কার্যকর পদক্ষেপ ও দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন। আর এই পরিবর্তন শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয় এটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। সেই দায়িত্ববোধ ও অঙ্গীকার থেকেই ৩৭টি সংগঠন যৌথভাবে “নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এখনই” শিরোনামে বিশেষ প্রচারাভিযানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আমাদের এই উদ্যোগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে পুরো বাংলাদেশের নাগরিক সমাজকে আরও ঐক্যবদ্ধ ও উদ্বুদ্ধ করবে।”
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)-এর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ তাঁর বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন “আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। নতুন এফএসআরইউ স্থাপন করলেই সমাধান হবে না; এর সঙ্গে পাইপলাইনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রশ্ন রয়েছে। তাই এলএনজি আমদানিতে আরও নির্ভরশীল না হয়ে আগামী তিন-চার বছরের মধ্যেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে হবে।”
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)-এর বাংলাদেশ বিষয়ক লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম, তাঁর বিশেষ অতিথি হিসেবে তাঁর বক্তব্যে বলেন “আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এখন আর বিকল্প নয়, জরুরি প্রয়োজন। আগামী তিন-চার বছরেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে হবে এর সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে সহজ অর্থায়ন, বিনিয়োগবান্ধব নীতি ও জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার।”
ঢাকা স্ট্রিম, সম্পাদক ও প্রকাশক, গোলাম ইফতেখার মাহমুদ তাঁর বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর আন্দোলন হিসেবে দেখলে চলবে না; এর সঙ্গে পরিবেশগত জবাবদিহি ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। আজ যে সৌর ও বৈদ্যুতিক রিকশার ব্যাটারি ব্যবহার করছি, সেগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে আগামী দিনে তা বড় ধরনের দূষণের উৎস হয়ে উঠতে পারে। তাই শুধু সোলার বাড়ানো নয়, ব্যাটারি ও ব্যবহৃত প্যানেলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ সামগ্রিক পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করে একসাথে নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই রূপান্তর এগিয়ে নিতে হবে।”
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেরিক পলিউশন স্টাডিজ (CAPS), অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার তাঁর বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন- জীবাশ্ম জ্বালানি যেমন একদিকে আমাদের বায়ু মন্ডলকে সরাসরি উত্তপ্ত করছে, তেমনই বাড়িয়ে দিচ্ছে বায়ু দূষণ। বায়ু দুষণ বৃদ্ধি পাওয়ার সোলার প্যানেলগুলোর উপর ধূলর স্তরও বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্যানেল এর কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার দূষণ কমাবে, আর দূষণ কমলে সোলার প্যানেল এর কার্যকরতা বৃদ্ধি করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
হাওর অঞ্চলবাসী’র সমন্বয়কারী জাকিয়া শিশির, “নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্রুত সম্প্রসারণ করতে জনগণকে অবশ্যই সচেতন করতে হবে। আইনি কাঠামো সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিনিয়োগ জীবাশ্ম জ্বালানি এখনই বন্ধ করা।”
আলোচনায় ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এ বিষয়ে বৃহত্তর জনসম্পৃক্ততা তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বায়ু ও পরিবেশ দূষণ না করে সাভার, আমিনবাজারে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরামর্শ আলোচকদের।
এ যৌথ আয়োজনের ৩৭টি সদস্য সংস্থা হল – ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ, সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেরিক পলিউশন স্টাডিজ, ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট, আপস ইয়ুথ অর্গানাইজেশন, ব্রাইটার্স, ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন, ওএবি ফাউন্ডেশন, রিভার বাংলা ,বেঙ্গল পিস ফাউন্ডেশন, তরঙ্গ ফাউন্ডেশন, ক্লাইমেট ফ্রন্টিয়ার, ড্রিম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন, রিভারাইন পিপল, এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভস, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন, সচেতন নাগরিক সমাজ সংগঠন, কোস্ট ফাউন্ডেশন, সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, সেন্টার ফর রিনিউএবল এনার্জি সার্ভিসেস লিমিটেড, আর্থস অ্যান্টস, কাসমাস অর্গানাইজেশন, বারসিক, হাওর অঞ্চলবাসী, স্বপ্নের সিঁড়ি সমাজকল্যাণ সংস্থা, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, ইকুইটি বিডি, সচেতন ফাউন্ডেশন, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য, গর্জন সমাজ কল্যাণ সংস্থা, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন, রিভার সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট বাংলাদেশ, গ্রিনওয়ে রিনিউএবল এনার্জি ইমপ্লিমেন্টেশন অর্গানাইজেশন, ইউনিভো, ইউক্যান ও গ্রিনপিস ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি।















