শামসুল আলম,ঠাকুরগাঁও:: ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় প্রায় ১৬-১৭ কোটি টাকার পেঁয়াজ বীজ বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।
গত কয়েক বছর আগে গম, ভুট্টা, আলুর চাষ বাদ দিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার চাষিরা। তাদের মধ্যে চাড়োল গ্রামের হাতে গোনা কয়েকজন চাষি শুরু করেছিলেন পেঁয়াজের বীজ চাষাবাদ। বীজ চাষাবাদ লাভজনক হওয়ায় ওই গ্রামেই চাষির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০০ জনের বেশি। চলতি বছর ৪৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় প্রায় ৪৩ হাজার কেজি পেঁয়াজের বীজের পাওয়া আশা করছেন তাঁরা।
এছাড়া পাশের দোগাছি গ্রামের ৫০ জন, ঠুমনিয়া গ্রামের ৬০ জনসহ উপজেলার মোট ৮ ইউনিয়নে ৪১৫ জন চাষি এখন আবাদ করছেন কালো সোনা হিসেবে পরিচিত পেঁয়াজের বীজ। কৃষকেরা বলছেন, আমন ধানের পর আলু, ভুট্টা অথবা গম উৎপাদন করলে খরচ বাদ দিয়ে ১৫-২০ হাজার টাকা লাভ তোলা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে থাকতে হয়। কিন্তু গত কয়েক বছরে পেঁয়াজের বীজ আবাদ চাষিরা লাভবান হয়েছেন ।
চলতি বছর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জরিপ থেকে জানা গেছে, উপজেলার ৮ ইউনিয়নে ৪১৫ জন চাষি প্রায় ৮৯ হেক্টর জমিতে কিং, কুইন, তাহেরপুরী ও সুখসাগর জাতের পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করেছে। এতে সম্ভাব্য বীজ উৎপাদন ধরা হয়েছে ৯১ হাজার ৮৬১ কেজি। যার বাজারমূল্য প্রায় ১৬-১৭ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে চাড়োল ও দোগছি গ্রামে। এ দুটি গ্রামের প্রায় ৩০০ জন চাষি আবাদ করেছেন ৫৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ বীজ। আশানুরূপ ফলন হলে কমপক্ষে ৯ কোটি টাকা পেঁয়াজের বীজ বিক্রি করবেন এই দুই গ্রামের চাষিরা।
অথচ গেল বছর উপজেলাটিতে মাত্র ২৬ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন হয়েছিল। চাষাবাদ করেছিলেন চাড়োল ও দোগাছি গ্রামের চাষিরা।
মৌমাছি না থাকায় হাতের স্পর্শে পেঁয়াজ ফুলে কৃত্রিম পরাগায়ন করছেন নারীরা। গতকাল শুক্রবার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার চাড়োল গ্রামে সরেজমিনে দেখা গেছে, পেঁয়াজের সাদা ফুলে ভরে গেছে মাঠ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পেঁয়াজের বীজ খেতে সেচ, স্প্রে এবং শ্রমিকদের নিয়ে কৃত্রিম পরাগায়নে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। কীটনাশক দিয়ে স্প্রে করার কারণে খেতে মৌমাছি নেই। স্প্রে করা না হলে কৃত্রিম পরাগায়নের প্রয়োজন পড়ত না।
গেল বছর চাড়োল গ্রামের সাইদুর রহমান আড়াই বিঘা জমিতে পেঁয়াজের বীজ লাগিয়েছিলেন। বীজের দাম ভালো থাকায় উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে তিনি সাড়ে ৭ লাখ টাকা লাভ পেয়েছেন। এ বছর আরও দেড় বিঘা বাড়িয়ে ৪ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ লাগিয়েছেন তিনি। সাইদুর রহমান জানান, এ বছর সার-কীটনাশক ও মজুরির বাদ বাড়লেও পেঁয়াজ খেতের অবস্থা ভালো। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি।
ওই গ্রামের চাষি তৈমুর আলী বলেন, ১ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করতে খরচ হয় ৭০-৭৫ হাজার টাকা। ভালো ফলন হলে প্রতি বিঘায় ২০০ থেকে ২২০ কেজি পেঁয়াজের বীজ পাওয়া যাবে। গেল বছরে প্রতি কেজি বীজ ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। চলতি বছর শোনা যাচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম উঠেছে। এই দাম পরে আরও বাড়বে।
এদিকে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনকে ঘিরে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে ওই এলাকার নারী-পুরুষদের। সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত পেঁয়াজের ফুলে হাতের ছোঁয়া দিয়ে কৃত্রিম পরাগায়নের কাজ করছেন নারীরা। আগাছা পরিষ্কার, স্প্রে এবং সেচের কাজ করছেন পুরুষেরা।
মৌমাছি না থাকায় হাতের স্পর্শে পেঁয়াজ ফুলে কৃত্রিম পরাগায়ন করছেন নারীরা। আজ শুক্রবার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার চাড়োল গ্রামে তোলাচাড়োল গ্রামের পেঁয়াজ খেতে হাতের ছোঁয়া দিয়ে কৃত্রিম পরাগায়নের কাজে নিয়োজিত সীতা রানী ও মল্লিকা রানী ,রিতু বালা জানান ৫০ টাকা ঘণ্টা হিসেবে প্রতিদিন ৪ ঘণ্টা কাজ করেন ওই এলাকার শতাধিক নারী। বাড়ির কাজের পাশাপাশি ২০০ টাকা দিনে বাড়তি আয়ে বেশ খুশি তারা। যদিও এই সময়টা কাজ না পেয়ে বসে থাকতে হতো তাঁদের।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনে ঝুঁকছেন স্থানীয় বেকার যুবকেরা। এর ফলে দিনদিন বাড়ছে পেঁয়াজ বীজ চাষাবাদের পরিধি। এলাকায় তৈরি হচ্ছে তরুণ উদ্যোক্তা।
চাকরি না পেয়ে চলতি বছর থেকে কৃষি কাজে নেমেছেন চাড়োল গ্রামের বিপ্লব রানা। এবার পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করেছেন ১৫ বিঘা জমিতে। তিনি জানান, চার মাস পরিশ্রম করে পেঁয়াজ বীজটা বাজারে বিক্রি করতে পারলেই কমপক্ষে ৩০ লাখ টাকা লাভ হবে। একটা সরকারি চাকরি করে পেনশনের টাকা এক বছরেই আয় করা সম্ভব। চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেই উদ্যোক্তা হয়েছেন তিনি। প্রতিদিন তার খেতেই কাজ করছেন ২০ জন শ্রমিক।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন সোহেল বলে, চলতি বছর পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন বেড়েছে। চাড়োল গ্রামের চাষিদের দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন কৃষকেরা। আমরা কৃষকদের পাশে থেকে নানা ভাবে পরামর্শ ও সহযোগিতা করছি। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় আশা করছি এ বছর প্রায় ৯২ টন পেঁয়াজ বীজ আমরা পাব। বাজারে যার মূল্য প্রায় ১৬-১৭ কোটি টাকা।













