জান্নাতুন ফেরদাউস মৌ :: শিক্ষা মানুষের জীবনের একটি মৌলিক ভিত্তি, আর সেই ভিত্তি সবচেয়ে শক্তভাবে গড়ে ওঠে শৈশবে। এই সময়ের শেখা শুধু বইয়ের পাতা বা মুখস্থ জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে শিশুরbb সামগ্রিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় তাই গুরুত্ব পাচ্ছে এমন কিছু পদ্ধতি, যা শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহল, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির সাথে শেখাকে যুক্ত করে। এর মধ্যে অন্যতম কার্যকর একটি পদ্ধতি হলো সেনসরি বেসড লার্নিং।
সেনসরি বেসড লার্নিং এমন একটি শিক্ষণ প্রক্রিয়া, যেখানে শিশুর পাঁচটি ইন্দ্রিয়—দৃষ্টি, শ্রবণ, স্পর্শ, ঘ্রাণ ও স্বাদের মাধ্যমে শেখাকে সক্রিয় ও অর্থবহ করে তোলা হয়। শিশু যখন কোনো বিষয় শুধু শুনে বা পড়ে না, বরং নিজে স্পর্শ করে, দেখে, বা অভিজ্ঞতা নেয়, তখন তার শেখার গভীরতা বৃদ্ধি পায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি শিশু যদি বইয়ে “মাটি” শব্দটি পড়ে, সেটি একটি তথ্য হিসেবে থেকে যেতে পারে। কিন্তু সে যদি মাটি স্পর্শ করে, তার গন্ধ নেয়, বা মাটি দিয়ে কিছু তৈরি করে, তখন সেই অভিজ্ঞতা তার মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে।
এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি শিশুর শেখাকে আনন্দদায়ক করে তোলে। শেখা তখন আর কোনো চাপের বিষয় থাকে না; বরং হয়ে ওঠে একটি খেলাধুলার মতো অভিজ্ঞতা। এর ফলে শিশুদের মনোযোগ বৃদ্ধি পায়, তারা বেশি সময় ধরে একটি বিষয়ে যুক্ত থাকতে পারে এবং শেখার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে ওঠে। পাশাপাশি, সেনসরি কার্যক্রম শিশুর সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শ্রেণিকক্ষে সেনসরি বেসড লার্নিং বাস্তবায়ন করা খুব জটিল কিছু নয়। একজন সচেতন শিক্ষক অল্প উপকরণ দিয়েও এটি প্রয়োগ করতে পারেন। যেমন—বর্ণ শেখানোর সময় শিশুদের বালু বা মাটির উপর আঙুল দিয়ে অক্ষর আঁকাতে দেওয়া যেতে পারে। রং শেখানোর ক্ষেত্রে বাস্তব বস্তু ব্যবহার করে শিশুদের রং চেনানো যেতে পারে। গণিত শেখানোর সময় কাঠি, পাথর বা গুটি ব্যবহার করে গণনা শেখানো হলে তা সহজেই বোধগম্য হয়। বিজ্ঞান শিক্ষায় ছোট ছোট পরীক্ষা-নিরীক্ষা শিশুদের কৌতূহল বাড়ায় এবং বাস্তব জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে।
তবে এই পদ্ধতি প্রয়োগে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, বিশেষ করে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে। অনেক সময় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি থাকে, প্রয়োজনীয় উপকরণ সবসময় পাওয়া যায় না, কিংবা সময়ের সীমাবদ্ধতা থাকে। তবুও শিক্ষক যদি সৃজনশীল হন এবং স্থানীয় সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করেন, তাহলে এই বাধাগুলো অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
সর্বোপরি, সেনসরি বেসড লার্নিং এমন একটি শিক্ষাপদ্ধতি, যা শিশুদের শেখাকে জীবন্ত, বাস্তব এবং অর্থবহ করে তোলে। এটি কেবল তথ্য প্রদান করে না, বরং শিশুদের চিন্তা করতে শেখায়, অনুভব করতে শেখায় এবং নিজের মতো করে বিশ্বকে বুঝতে সাহায্য করে। তাই আমাদের উচিত শিক্ষাব্যবস্থায় এই পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা, যাতে শিশুরা আনন্দের সাথে শেখার সুযোগ পায় এবং একটি সুস্থ ও সৃজনশীল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
জান্নাতুন ফেরদাউস মৌ
সহকারী শিক্ষক, পশ্চিম পালি আদিবাসী আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জয়পুরহাট














