শামসুল আলম, ঠাকুরগাঁও:: ঠাকুরগাঁওয়ে চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। এই নিয়ে আনন্দের কমতি ছিল না কৃষকদের মধ্যে। তবে বাজারে দামে ধস নেমেছে। উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, তুলনামূলক কম দামেও আলু বিক্রি করতে পারছেন না কৃষকেরা। অনেক এলাকায় ৬০ কেজির এক বস্তা আলু ২৫০-৩০০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে না। সেই হিসাবে প্রতি কেজি আলুর দাম পড়েছে ৩ টাকার কিছু বেশি। এমন পরিস্থিতিতে আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করবেন নাকি বাড়িতেই রাখবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষকেরা।
সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের এলাকার কৃষক শামীম হেসেন জনান ১০বিঘা জমিতে গ্যানুলা জাতের আলু লাগিয়েছি। কিন্তু এখন আলু নেওয়ার মতো পাইকারই পাচ্ছি না। এক বস্তা (৬০ কেজি) আলু ২৫০ টাকাতেও বিক্রি হচ্ছে না। উল্টো ব্যবসায়ীরা প্রতি বস্তায় আরও তিন কেজি বেশি দিতে বলছেন। হিমাগারে রাখব, নাকি বাসায় রাখব; সেই চিন্তায় আছি।তিনি আরও বলেন, এক বিঘা জমিতে আলু লাগানো, সার, কীটনাশক, সেচ, উত্তোলনসহ খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। অথচ সেই জমির আলু এখন ২০ হাজার টাকাও বিক্রি হচ্ছে না। এমতাবস্থায় এ অঞ্চলে বিদেশে রপ্তানীর ব্যবস্থা ও দ্্রুত খাদ্র প্রক্রিয়া জাত শিল্প গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে।
একই এলাকার কৃষক নুরুল আলম বলেন, ভালো সময়ে প্রতিটি আলুর ওজন ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম হয়। তখন দামও ভালো পাওয়া যায়। কিন্তু এবার পচন রোগে গাছ আগেই মরে গেছে। ফলে আলুর আকার ছোট হয়েছে। এসব আলু কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৪ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচের অর্ধেকও উঠছে না।
সদর উপজেলার আখানগর এলাকার কৃষক মুনসুর আলী বলেন, এক বিঘা জমিতে ভালো ফলন হলে ৫ হাজার কেজি আলু পাওয়া যায়। কিন্তু এবার রোগের কারণে ফলন কমে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার কেজিতে নেমেছে। উৎপাদন কম, দামও কম দুই দিক থেকে ক্ষতির মুখে পড়েছি।
আরেক কৃষক মেহেদি হাসান বলেন, গত মৌসুমেও লোকসান হয়েছে। এবার ভেবেছিলাম, পরিস্থিতি ভালো হবে। কিন্তু এখন আলুর বাজারে ধস নেমেছে। কেজি প্রতি গ্যানুলা ৪ টাকা, এস্টেরিক্স ৬ টাকা, সানসান ৬ টাকা ও কুমড়িকা ৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এভাবে চললে আলু চাষ বন্ধ করে দিতে হবে।
আলু ব্যবসায়ীরাও জানিয়েছেন, বাজারে চাহিদা কম থাকায় তাঁরা আলু কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
ঠাকুরগাঁও সদরের পাইকারি আলু ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, এবার বাজারে আলুর সরবরাহ অনেক বেশি; কিন্তু চাহিদা কম। রমজান মাস এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাজার স্থবির হয়ে আছে। আমরা কিনলেও বিক্রি করতে পারছি না।
আরেক ব্যবসায়ী আনোয়ার হেসেন বলেন, হিমাগারেও জায়গা সীমিত। বেশি দামে কিনে সংরক্ষণ করলে পরে লোকসান হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ঝুঁকি নিতে পারছি না। কৃষকদের কষ্ট আমরা বুঝি, কিন্তু বাজার পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ২৮ হাজার হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। আবাদ হয়েছে ২৮ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ টন। গত মৌসুমে ৩৪ হাজার ৭২৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করে ৮ লাখ ৬৮ হাজার ১২৫ টন উৎপাদিত হয়েছিল। জেলায় ১৭টি হিমাগারে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫৩২ টন আলু সংরক্ষণ করা যায়, যা মোট উৎপাদনের তুলনায় অনেক কম।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁওয়ের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, গত মৌসুমে লোকসানের পর কৃষকদের কম জমিতে আলু চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেক কৃষক বেশি লাভের আশায় আবারও বেশি জমিতে আবাদ করেছেন। এখন উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে এবং দাম কমেছে।মাজেদুল আরও বলেন, আগে ঠাকুরগাঁওয়ের আলু দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হতো। এখন অন্যান্য জেলাতেও আলু চাষ বাড়ায় চাহিদা কমেছে। আমরা কৃষকদের বিকল্প ফসল চাষ এবং পরিকল্পিত উৎপাদনের বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছি, যাতে ভবিষ্যতে তাঁরা লোকসানের ঝুঁকি কমাতে পারেন।














