
মামনুর রশীদ:: শিক্ষা শব্দের আদি উৎস সংস্কৃত ‘শাস’ ধাতু, যার আক্ষরিক অর্থ শাসন বা শৃঙ্খলা। তবে সভ্যতার বিবর্তনে আধুনিক আন্তর্জাতিক অবয়বে শিক্ষা আজ আর কোনো শৃঙ্খল নয়, বরং মানুষের আচরণের কাঙ্ক্ষিত ও ইতিবাচক পরিবর্তনের এক মুক্ত বাতায়ন। ব্যক্তি ও সামষ্টিক রূপান্তরের এই শাশ্বত হাতিয়ারটিকে যুগে যুগে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মনীষীগণ নানা অভিধায় ভূষিত করেছেন। প্রাজ্ঞ সক্রেটিসের চোখে শিক্ষা ছিল মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের অনুপম বিকাশ।
অন্যদিকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষার সংজ্ঞায় এনেছিলেন এক মরমী বৈচিত্র্য; তাঁর মতে, প্রকৃত শিক্ষা কেবল তথ্য পরিবেশন করে না, বরং বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের জীবনকে গড়ে তোলে। আধুনিক বিজ্ঞানের বরপুত্র আলবার্ট আইনস্টাইনও এই সুরেই সুর মিলিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, শিক্ষা কোনো তথ্য গলাধকরণের নাম নয়, বরং স্বাধীন চিন্তার মানসিক সক্ষমতা এবং সহজাত কৌতূহলের লালনভূমি। বিদ্যালয় নামক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর শেখানো সবকিছু ভুলে যাওয়ার পর মানুষের ভেতর যে আত্মিক নির্যাসটুকু অবশিষ্ট থাকে, আইনস্টাইনের দৃষ্টিতে সেটাই আসলে প্রকৃত শিক্ষা। চিরন্তন এই মননশীল দর্শনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ভাববার সময় এসেছে—কেমন হওয়া উচিত আমাদের বুনিয়াদি বা প্রাথমিক শিক্ষার পরিকাঠামো।
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, দার্শনিক এবং মনস্তাত্ত্বিকদের কালজয়ী তত্ত্বগুলোকে যদি আমরা একটি সুতোয় গাঁথি, তবে আদর্শ প্রাথমিক শিক্ষার এক চমৎকার ও মানবিক রূপরেখা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের নান্দনিকতা, নজরুলের সাম্যবাদ, সক্রেটিস ও এরিস্টটলের অকাট্য যুক্তি কিংবা আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক কৌতূহল—সবকিছুই মূল অভীষ্ট ছিল শিশুকে যান্ত্রিক ছাঁচ থেকে মুক্ত করা। আইনস্টাইন যেভাবে শিক্ষাকে মনকে সচল করার ব্যায়াম হিসেবে দেখতেন, সেই ভাবনার বাস্তব প্রয়োগ ঘটতে পারে প্রাথমিক স্তরে সক্রেটিসের প্রশ্নোত্তর পদ্ধতির মাধ্যমে।
সেখানে শিক্ষক শিশুকে কোনো তৈরি উত্তর মুখস্থ করাবেন না, বরং এমন সব বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবেন যার জট খুলতে গিয়ে শিশু নিজের যুক্তি দিয়ে ভুলকে ভাঙবে এবং সত্যকে আবিষ্কার করবে। এর সাথে যুক্ত হতে হবে রবীন্দ্রনাথের সেই ‘খাঁচার শিক্ষা’ থেকে মুক্তির দর্শন, যা আজ আধুনিক বিশ্বও পরম শ্রদ্ধায় লুফে নিচ্ছে। শিশুদের মন প্রাকৃতিকভাবেই অনুসন্ধিৎসু, তাই তাদের শ্রেণীকক্ষ হওয়া উচিত উন্মুক্ত প্রকৃতির অবারিত আঙিনা। বিজ্ঞান, ভূগোল বা সাহিত্যের পাঠ্যপুস্তকীয় জটিলতা ভুলে যদি তারা গাছপালা, মাটি, পাখি আর ঋতু পরিবর্তনের আবর্তনে বেড়ে ওঠে, তবেই শিক্ষণ স্থায়ী হয়। বর্তমান ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে, বিশেষ করে ফিনল্যান্ডে প্রচলিত ‘ফরেস্ট স্কুল’ বা আউটডোর লার্নিং মূলত রবীন্দ্র দর্শনেরই এক আধুনিক বৈশ্বিক রূপান্তর।
একটি আদর্শ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো কৃত্রিম র্যাংকিং, কঠোর গ্রেডিং বা তীব্র প্রতিযোগিতার বিষাক্ত চাপ থাকা মোটেও কাম্য নয়। ফরাসি দার্শনিক রুশো, মারিয়া মন্তেসরি কিংবা কিন্ডারগার্টেন ব্যবস্থার জনক ফ্রিডরিখ ফ্রয়েবেল প্রত্যেকেই দেখিয়েছেন যে, শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের সর্বোত্তম মাধ্যম হলো খেলার ছলে শেখা। পড়াশোনা কোনো তিতা বড়ি বা ভয়ের কারণ হবে না, তা হবে শিশুর কাছে একটি পরম উপহার কিংবা আনন্দের এক অন্তহীন উৎসব। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’-এ এই সত্যেরই এক জীবন্ত জবানবন্দি দিয়েছেন।
তিনি অকপটে উল্লেখ করেছেন যে, ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলের কঠোর গ্রেডিং ও বৈষম্যমূলক র্যাংকিং ব্যবস্থা তাঁর ভেতরের সহজাত মেধা বিকাশে কোনো সহায়তাই করতে পারেনি। পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনের প্রতিযোগিতাহীন মুক্ত পরিবেশ, প্রকৃতির অকৃত্রিম সান্নিধ্য এবং প্রশ্ন করার অবাধ স্বাধীনতাই তাঁর সুপ্ত চিন্তাশক্তিকে দারুণভাবে বিকশিত করেছিল। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, প্রাথমিক স্তরে কৃত্রিম প্রতিযোগিতার চেয়ে ভয়হীন ও আনন্দময় পরিবেশই শিশুর মেধা বিকাশের শ্রেষ্ঠ অনুঘটক।
গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল একদা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, হৃদয়কে শিক্ষিত না করে কেবল মনকে শিক্ষিত করা আসলে কোনো শিক্ষাই নয়। একই সুর বেজেছিল আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী ইশতেহারে। আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো হতে হবে সেই বৈষম্যহীন সাম্যের সূতিকাগার, যেখানে ধনী-দরিদ্র বা ধর্ম-বর্ণের কৃত্রিম দেয়াল থাকবে না।
পাঠ্যক্রমে এমন গল্প, নাটক বা সম্মিলিত কাজের সুযোগ রাখতে হবে যা শৈশবেই শিশুর অবচেতন মনে সহানুভূতি, সহমর্মিতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও জেন্ডার সমতার বীজ বুনে দেবে। সমাজকে কেবল ডিগ্রিধারী চতুর চাটুকার উপহার দেওয়ার চেয়ে সৎ ও মানবিক গুণসম্পন্ন ‘খাঁটি মানুষ’ তৈরি করাই হোক প্রাথমিক শিক্ষার মূল ব্রত। কারণ শিক্ষা মানে কেবল খাতা-কলমের যুদ্ধ কিংবা জিপিএ-৫ এর অন্ধ ইঁদুরদৌড় নয়, এটি শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক, শারীরিক ও মানসিক বিকাশের এক সুষম সমন্বয়। প্রাচীন রোমান কবি জুভেনালের সেই বিখ্যাত দর্শন—সুস্থ দেহে সুস্থ মন—অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষায় চিত্রাঙ্কন, সঙ্গীত, নৃত্য ও খেলাধুলাকে মূল পাঠ্যক্রমে গুরুত্বের সাথে নেওয়া আজ সময়ের দাবি। বিশ্বদর্শনের আয়নায় প্রাথমিক শিক্ষা কোনো অর্থকরী বিদ্যা অর্জনের কারখানা বা কেরানি তৈরির কারখানা নয়।
এটি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একজন আদেশ শিক্ষক প্রতিটি শিশুকে তার স্বকীয়তা ও বৈচিত্র্য নিয়ে বিকশিত হওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দেবেন। যে শিক্ষা শিশুকে প্রশ্ন করতে শেখায়, চারপাশকে ভালোবাসতে শেখায় এবং নিজের আত্মশক্তির ওপর বিশ্বাস রাখতে শেখায়—বিশ্বচিন্তার আলোকে সেটিই হলো প্রকৃত ও কাঙ্ক্ষিত প্রাথমিক শিক্ষা।
মামনুর রশীদ
উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পিরোজপুর সদর













